ইতিহাসের কলঙ্কিনী করিমুন নেছা

……………..কলঙ্কিনী করুমুননেসা……………

“ইটার রাজা কটু মিয়া লংলাত করলা বিয়া,
বড় স্বাদ আছিল কটুর লংলা দেখতা গিয়া”

কিংবা….
‘লংলা গাঁইয়া বেটি গো উঁছাত বান্ধো খোঁপা, হাইর গলাত ছিয়া ফালাইয়া দেশো রাখছো খোঁটা!
সিলেটি প্রবাদ হিসেবে সিলেটের প্রবীণ মানুষের মুখে এখনো শোনা যায়। পুরো সিলেটে যেনো এক ঘৃণিত চরিত্র। হৃদয়ের ভালোবাসাই তাকে ঘৃণার মানুষে পরিণত করেছে।

করিমুননেসা চৌধুরী সিলেট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার লংলা পরগণার কানাইটিকরের জমিদার গজম্বর আলী চৌধুরীর মেয়ে। রূপে গুণে অনন্যা করিমুন জমিদারকন্যা হলেও আভিজাত্যের প্রতি কোনো প্রকার মোহ ছিলো না তার। সহজ সরল মিষ্টভাষিণী প্রজাবৎসল জমিদার কন্যার মনে ধনী-দরিদ্রের কোন ভেদ ছিলো না । খাজনা পরিশোধে অপারগ প্রজাদের প্রতি জমিদার নিযুক্ত সরকার,পাইক পেয়াদার অত্যাচারের দৃশ্য তাঁকে বিচলিত করতো। জমিদারি শাসন নিয়ে ব্যস্ত পিতার কাছ থেকে তিনি তেমন একটা আদর ভালবাসা পাননি। পিতাকে সব সময়ই ব্যস্ততম অবস্থায় দেখেছেন। পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের চোখে তাঁর পিতার প্রতি ভালোবাসা নয়, ভয় দেখে দেখেই তিনি বড় হয়েছেন। জমিদার মহাশয় শুধু পরিবারে নয়,তাঁর স্টেট এরিয়ার মধ্যে যা বলেন তাই হত।

ভালোবাসার কাঙাল- করিমুননেসা সুবিশাল জমিদার বাড়ির ব্যস্ততম সকল সদস্যের ভীড়ে কাজের লোক ও নানকারদের সাথেই সখ্যতা গড়ে তুললেন। পরিবারের লোক সেটিকে ভালভাবে নিতে পারছিলনা ।প্রাণচঞ্চল কিশোরী জমিদার কন্যার জানার-পড়ার আগ্রহ প্রচুর। করিমুননেসার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হল বাবার কাচারি ঘরের নিযুক্ত সেরেস্তাদার (হিসাব রক্ষক)কে। তিনি অবসর সময়ে তাঁকে পড়া দেখিয়ে দিতেন। তরুণ সেরেস্তাদার আবুল কালামের নিকট করিমুননেসা আরবি-ফারসি, গণিত হিসাব নিকাশ শিখতে লাগলেন।পাঠের ফাঁকে মনের অযান্তেই মন বিনিময় হয়ে যায় দুজনের মাঝে। কিন্তু মুখ ফুটে কেউই কাউকে বলতে পারেন নি।…………

বলেননি সাহসের অভাবে। এরই মাঝে বিয়ে ঠিক হয় করিমুননেসার। পাত্র ইটার জমিদার দেওয়ান মো. মনসুর ওরফে কটু মিয়া। বাবা দেওয়ান মো. সাকির মৃত্যুর পর তিনি একাই ইটার বিশাল জমিদারি দেখাশোনা করছেন।

বিয়ের খবরে করিমুননেসার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল! ইচ্ছা করছিল চিৎকার করে বলতে এই বিয়েতে মত নেই আমারও পছন্দ থাকতে পারে! কিন্তু জমিদার পিতার মুখের উপর কথা বলার সাহস কারো নেই। কাউকে বললেও কিছু হবে না। অনিচ্ছা সত্বেও নিজের নিয়তি কে মেনে নিয়ে বিয়ের পর বাবার বাড়ি ছেড়ে করিমুননেসার ঠিকানা হয় ইটায়। একা সংসারে ভালো লাগে না করিমুন নেসার। স্বামীরও সময় নেই তিনি তার ব্যস্ত জমিদারি আর ভোগ-বিলাস নিয়ে। প্রায়সঃ কটু মিয়ার রাত্রি কাটে বাঈজী মহলে। ঘরে ফিরলেও প্রায় সময় থাকেন মাতাল।

স্বামীর সংসারে ভালোবাসার দেখা পেলে হয়তো প্রথম প্রেম ভুলেও যেতেন করিমুননেসা। একাকিত্ব তার ভেতর কে দুমড়ে মুচড়ে একাকার করে ফেলে তাঁর। বিয়ের পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে করিমুননেসার আবার দেখা হয় তার গৃহশিক্ষকের সাথে ভালোবাসার কাঙ্গাল । করিমুননেসা সিদ্ধান্ত নেন আর ফিরে যাবেন না ইটায়। এরই মাঝে কটু মিয়া বেড়াতে আসেন লংলায়। ঐদিন রাত্রে শ্বশুরবাড়িতে রহস্যজনক মৃত্যু হয় কটু মিয়ার। ঘটনা ধামাচাপা দিতে জমিদার গজম্বর আলী চৌধুরী কটু মিয়ার লাশ ইটায় পাটিয়ে দেন এবং চিঠি লিখে উল্লেখ করেন কলেরা হয়ে মারা গেছেন ইটার জমিদার। কিন্তু গোসলের সময় লাশের মুখে রক্ত দেখে কটু মিয়ার পরিবার থানায় ডাইরি করেন। শুরু হয় পুলিশ তদন্ত…।

এ মৃত্যু নিয়ে সিলেটে অনেক লোকগল্প প্রচলিত আছে, কোনো গল্পমতে খোঁপার কাঁটায় গেঁথে করিমুননেসা হত্যা করেন কটু মিয়াকে। কোনো কাহিনী বলছে, গলায় ধান ভানার লাটি (ছিয়া) চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে কটু মিয়াকে হত্যা করেন করিমুননেসা। আবার কোনো কাহিনী অনুসারে শরবতের সাথে বিষ খাইয়ে স্বামীকে হত্যা করেন করিমুননেসা।

করিমুননেসা সেরেস্তাদার আবুল কালামের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে আত্মগোপনে করেন।
করিমুন নেছার পলায়ন সন্দেহের তীর তার দিকেই ধেয়ে আসে। ১৮৭০ সালের এ ঘটনায় মামলা উঠে সিলেটের আদালতে।
গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হয় কিন্তু পুলিশ তাকে ধরতে পারেনা। এদিকে কটু মিয়ার পরিবার বৃটিশ জমিদার হওয়াতে বেশ প্রভাব, মামলা দ্রুত রানিং এ উঠে।
নবাব আমলী জমিদার গজম্বর আলী চৌধুরী হাল না ছেড়ে মামলার মোকাবেলা করতে লাগলেন। চলতি বছর খরায় পর্যাপ্ত খাজনা আদায় না হওয়া হত্যা মামলা এবং ঘন ঘন শুনানী….মামলা সামাল দিতে গিয়ে করিমুননেসার বাবা একের পর এক মৌজা বিক্রি করতে লাগলেন। করিমুননেসা তখন আত্মগোপনে। এদিকে করিমুননেসাকে ধরার জন্য পুরষ্কার ঘোষণা করা হল।

পুলিশ কিছুতেই নাগাল পাচ্ছিলো না তাঁর। পরে পীরের ছদ্মবেশে অনুসন্ধানে নামেন মামলার তদন্তকারী দারোগা আহসান রেজা চৌধুরী। তার কৌশল কাজে দেয়। বিবেকের দংশনে পুড়তে থাকা করিমুননেসা পীর ভেবে দারোগার কাছে এসে মনের শান্তির জন্য সব কিছু খুলে বলেন
জানান সেদিন রাত্রের প্রকৃত ঘটনা!
শ্বশুর বাড়ির জলসা ঘর থেকে কটু মিয়া ঘরে প্রবেশ করলে করিমুননেসা যথারীতি সরবতের দুইটা গ্লাসের মধ্যে একটিতে বিষ গুলেন এবং কটুমিয়া কে জানান তাকে মুক্তি না দিলে তিনি সরবতে মেশানো বিষপানে আত্মহত্যা করবেন। কটু মিয়া কারণ জানতে চাইলে জমিদারি প্রথার প্রতি করিমুননেসার অনিহা, স্বাভাবিক জীবন যাপনে আগ্রহ এবং সেরেস্তাদারের প্রতি ভালোবাসার আকুলতা প্রকাশিত হয়। কটুমিয়া সেরেস্তাদার কে ঢেকে আনেন এবং এ বিষয়ে জানতে চান। সেরেস্তাদার আবুল কালাম ভালোবাসার কথা স্বীকার করে এবং করিমুনের জন্য যেকোন কিছু করতেও রাজি জানালে কটু মিয়া স্ত্রী কর্তৃক ত্যাগ হওয়ার আত্মসম্মান এবং স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কারণে জানান এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারেনা।
ভালোবাসার প্রমান দিতে সেরেস্তাদার এবং জমিদার কটু মিয়া করিমুননেসার উপস্থিতিতেই দুজনে দুইটি সরবতের গ্লাস হাতে তুলে নেন। দূর্ভাগ্যবশত বিষযুক্ত গ্লাস কটু মিয়ার হাতে যায়। মুহুর্তেই কটুমিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
করিমুননেসা চাইলেই আটকাতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেন নি। এবং মনের শান্তি বিবেকের দংশন থেকে পরিত্রাণের উপায় প্রার্থনা করেন । পরে ঐ দারোগাই তাকে আটক করে তাঁর গ্রামে নিয়ে আসলে উত্তেজিত জনতা করিমুননেসার চুল কেটে দিয়ে কোর্ট হাজতে সোপর্দ করে।

১৮৭০ সাল… দিন তারিখ জানা যায়নি, তবে দিনটা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশ গম্ভীর ছিল। করিমুন নেছাকে কোর্টে হাজির করা হয়। কিন্তু সেদিন তার পক্ষে সিলেট কোর্টে কোন আইনজীবী ছিলেন না। শান্ত কোমল স্বভাবের ১৫-১৬ বছরের কিশোরী করিমুননেছা আদালতে নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করলেন না । বরং বাঁচাতে চেয়েছিলেন তাঁর ভালোবাসাকে! সবাইকে অবাক করে দিয়ে সব দোষ একা নিজের ঘাড়ে নিয়ে ১৬৪ ধারায় তিনি জবানবন্দি দিলেন এবং ভালবাসার মানুষ সহ বাকিদের নির্দোষ দাবি করে মুক্তি প্রার্থনা করলেন।
তবে আদালত তা মানেননি। বিচারক কভার্ন করিমুননেসাসহ ৪ জনকে ফাঁসির দন্ড প্রদান করেন। সিলেটের ইতিহাসে সেই প্রথম কোন মহিলা এবং প্রথম একসাথে এতজনের ফাঁসির দন্ড হয়। সিলেট কারাগারেই করিমুননেসা, সেরেস্তাদার আবুল কালাম সহ মোট চার জনের ফাঁসি কার্যকর হয়।
জমিদার কন্যার লাশ হস্তান্তর করার জন্য কোন ওয়ারিশ পাওয়া যায়নি……. তার লাশ কেউ গ্রহণ করতে আসেনি!

বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তার দাফন হয় সিলেট শহরের অদূরে বর্তমান দঃ সুরমা উপজেলাধীন গোটাটিকর এলাকার ষাইটঘরের জামে মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে।
করিমুননেসার কর্তিত চুল দীর্ঘদিন ধরে রাখা ছিল সিলেটের তোপখানা (ক্বীনব্রীজের নিচে) নওয়াব আলী আমজদ খাঁর ঐতিহাসিক ঘড়ি ঘরে। ইতিহাসে করিমুনেসার স্থান হয়েছিল কলঙ্কিনী রূপে।তার এই কলঙ্কের মাসুল দিতে তার পিতাকে জমিদারীর পুরোটাই হারাতে হয়েছিল।লাঞ্চনা থেকে রেহাই পেতে করিমুনের পিতা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে গ্রাম ছেড়ে দূরে প্রায় নির্জনে বাকি দিন অতিবাহিত করেন। লংলার কানাইটিকর গ্রামে পড়ে আছে সাহেব বাড়ির কিঞ্চিত নিদর্শন।
করিমুন নেছাকে গ্রেপ্তার করার কারণে দারোগা এহসান রাজা চৌধুরী পুরস্কৃত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার নিয়োগ হয়েছিল পৃত্থিমপাশা স্টেট এর ম্যানেজার হিসেবে।
দুর্ভাগা কটু মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দেওয়ানির সবটুকুই বিলীন হয়ে যায়।
ইটার বিশাল জমিদার কটু মিয়ার বাড়ির কিছুই অবশিষ্ট নেই কিছু ধ্বংসস্তুপ ছাড়া।
শুধুমাত্র করিমুননেসার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কুলাউড়ার লংলা এলাকার মেয়ে বিয়ে করিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন তৈরীতে ঘটনার প্রায় ১৫০ বছর পরেও বহু মানুষ বৈরীতা প্রকাশ করে!
লংলায় জন্ম নেওয়া নিরীহ মেয়েরা আজও অজ্ঞ সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত খোঁটার শিকার হয়।

‘কলঙ্কিনী’ করিমুননেসাকে কেউ আর স্মরণ করে না। কিন্তু ইতিহাসে ভালোবাসার এক ‘নিষিদ্ধ’ নাম হয়েই টিকে আছেন তিনি।

তথ্য সংগ্রহঃ প্রবাদ, লোককথা নিরীক্ষণ, বিভিন্ন মিডিয়ার সহযোগীতা গ্রহণ করা হয়েছে।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started